ছোট ঠাকুরের গোষ্ঠী
বীরেশ্বরন্যায়ালঙ্কার ঠাকুরের কনিষ্ঠ পুত্র শ্যামসুন্দর ঠাকুর ও তাঁহার ধারার পরিচয়
[ইঁহারা ছোট ঠাকুরের গোষ্ঠী বা সাতবাড়ীর ঠাকুর বলিয়া অভিহিত]
শ্যামসুন্দর ঠাকুর
বীরেশ্বর ন্যায়ালঙ্কার ঠাকুরের কনিষ্ঠ পুত্র। ইনি বিদ্যায় ও ব্রাহ্মণ্যে পিতার যোগ্য সন্তানই ছিলেন। ইঁহার পত্নীর নাম ছিল লক্ষ্মীদেবী। শ্যামের সহিত লক্ষী মিলিয়া ছিল ভাল, মিলের ফলও অঢেল, সাত পুত্র, ঠানদিদির ষষ্ঠী নাম হইলেই ছিল ভাল। যাহোক, লক্ষ্মী, ষষ্ঠী, ঠানদিদি আমাদের আশীর্ব্বাদ করুন। সাত পুত্র সাত দিক্পাল। পুত্রসম্পদের সহিত ইঁহার শিষ্যসম্পদও যথেষ্ট। তন্মধ্যে কলিকাতা পোস্তার ভূতপূর্ব্ব জমীদার, বর্ত্তমান সত্যজীবন ঠাকুরের অতিবৃদ্ধ প্রপিতামহ হরুঠাকুর অন্যতম। হরুঠাকুর শ্যামসুন্দরের নিজ মন্ত্রশিষ্য। একান্ত গুরুভক্ত ঐ হরুঠাকুর গুরু শ্যামসুন্দর ও গুরুপত্নী লক্ষ্মীদেবীর নামে কাশীধামে এওবটতলা নামক স্থানে শ্যামলক্ষ্মী যুগল মূর্ত্তি প্রতিষ্ঠা করেন। এখনও উহা তথায় পূজিত হইতেছেন। এরূপ গুরুশিয্য সম্বন্ধের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বিরল। শ্যামসুন্দর তাঁহার পিতার মত অনেক সৎকার্য্য করিয়া গিয়াছেন, তন্মধ্য়ে ২৪ পরগণার বাদূ নামক স্থানের এক বাজারে জলকষ্ট থাকায় উহার দক্ষিণ দিকে একটি পুষ্করিণী কাটাইয়া দেন। উহাও ঠাকুর পুকুর নামে অদ্যাপি অভিহিত হইয়া আসিতেছে। আর ১১৭৪ সালের মন্বন্তরের সময় পাঁচশত মণ চাউল দরিদ্রগণের মধ্যে বিতরণ করিয়াছিলেন, এই দুইটি সৎকার্য্যের কথা আজও লোকমুখে কীর্ত্তিত হইয়া থাকে। এই মহাপুরুষের স্বহস্ত লিখিত চন্দ্রশেখর বাচস্পতির স্মৃতিসর্ব্বস্ব নামক গ্রন্থ আজও তাঁহার পবিত্র স্মৃতিকে প্রত্যক্ষরূপে জাগাইয়া রাখিয়াছে। উহা ১৬৬৬ শকাব্দে লিখিত। এই বংশেরই পণ্ডিত শ্রীযুক্ত কাশীপতি স্মৃতিভূষণের বাড়ীতে উহা রক্ষিত হইয়া আছে। ইনি বড় শিল্পী ছিলেন। এক সময়ে রোগশয্যায় থাকেন আর সেই সময়ে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ভাটপাড়ায় আসেন। তিনি উঠিতে পারেন না কিন্তু রাজাকে অভিনন্দনতো করা চাই; তিনি করিলেন কি না একশত স্বরচিত অনুষ্টুপশ্লোক একখানি ১০ আঙ্গুল * ১ আঙ্গুল ভূর্জপত্রে লিখিয়া রাজ সন্নিধানে প্রেরণ করেন। রাজা ঐ শিল্পে ও পাণ্ডিত্যে সন্তুষ্ট হইয়া তাঁহাকে একশত বিঘা ভূমি দান করেন। বংশধরেরা এখনও তাহা ভোগ করিতেছেন।
রামরাম সার্ব্বভৌম
শ্যামসুন্দরের জ্যেষ্ঠ পুত্র। ইনি নানাশাস্ত্রে সুপণ্ডিত হইয়া বংশের মুখ উজ্জ্বল করিয়াছিলেন।
রামতনু বিদ্যাসাগর
রামরাম ঠাকুরের জ্যেষ্ঠ পুত্র। তন্ত্রশাস্ত্রে অভিজ্ঞ ছিলেন, বংশোচিত গুণে ও সারল্যে সকলেরই প্রীতিভাজন ছিলেন। স্বজনপোষণই ইঁহার ব্রত ছিল।
রাঘবরামঠাকুর
রামতনুর জ্যেষ্ঠ পুত্র। বংশোচিত গুণসম্পন্ন ছিলেন।
যদুনাথ ঠাকুর
রাঘবরামের পুত্র। দীর্ঘাকার সরল প্রকৃতি অমায়িক লোক ছিলেন। ইনি নব্যাবস্থায় হাঁটিয়া কামাখ্যায় গিয়াছিলেন। গাছচালা ডাকিনী প্রভৃতি তথায় আছে বলিয়া তাঁহার বিশ্বাস ছিল। ৮৭ বর্ষ বয়সে ৺কাশীলাভ করেন।
তারাপ্রসন্ন বিদ্যারত্ন
যদুঠাকুরের পুত্র। ইনি একজন কাব্যালঙ্কার নামজাদা অধ্যাপক ছিলেন। মূলাজোড় সংস্কৃত কলেজে দীর্ঘকাল অধ্যাপনা করিয়া বহুছাত্রকে কাব্যশাস্ত্রে পণ্ডিত করিয়া গিয়াছেন। শেষে কলিকাতা রাজকীয় সংস্কৃত কলেজের সংস্কৃতাধ্যাপক হন। পেনসনের পূর্ব্বেই ইঁহার গঙ্গালাভ হয়। ইঁহার অভাবে ভাটপাড়া ক্ষতিগ্রস্থ হইয়াছে।
কাশীনাথ ঠাকুর
রামতনুর ২য় পুত্র। বংশোচিত মর্য্যাদাসম্পন্ন ছিলেন।
রামচন্দ্র ঠাকুর
কাশীনাথের পুত্র। বড় মিষ্টস্বভাবের লোক ছিলেন।
পুর্ণচন্দ্র ঠাকুর
রামঠাকুরের জ্যেষ্ঠপুত্র। বড়ই অধ্যবসায়ী ছিলেন নিজের যত্নে ইনি প্রসিদ্ধ ইঞ্জিনিয়ার ক্ষেত্রমোহন ভট্টাচার্য্যের নিকট হইতে ইঞ্জিনিয়ারিং
বিদ্যা সম্যকরূপে আয়ত্ব করিয়া ছিলেন। স্বভাব অতি নির্ম্মল ছিল নির্ব্বিরোধী ব্যক্তি ছিলেন।
অমলচন্দ্র ঠাকুর
রামঠাকুরের ২য় পত্নীর ১ম পুত্র। চিত্রবিদ্যায় অধিকারী ছিলেন। স্বভাব অমায়িক ছিল। বাদ্যযন্ত্রে হাত ছিল। অকালে দেহ যায়।
নির্ম্মলচন্দ্র ঠাকুর
রামঠাকুরের ২য় পত্নীর ২য় পুত্র। শান্তস্বভাব ও নির্বিরোধী ব্যক্তি ছিলেন। অকালে দেহ যায়।
বিমলচন্দ্র ঠাকুর
রাম ঠাকুরের ২য় পত্নীর ৩য় পুত্র। ইনি শান্তস্বভাব ও নির্বিরোধী ছিলেন। অকালে দেহ যায়।
শ্রীরামঠাকুর
রামতনু ঠাকুরের ৪র্থ পুত্র। ইনি তন্ত্রে ও জ্যোতিষে অধিকারী ছিলেন। ঐ নিষ্ঠাবান্ সাত্বিক পুরুষের কাহারও সঙ্গে বিরোধ ছিল না। ইঁহার হস্তলিখিত অনেক পুঁথি ইঁহার স্মৃতি রক্ষা করিতেছে।
কালীপ্রসন্ন বিদ্যারত্ন
শ্রীরামঠাকুরের পুত্র। সংস্কৃতে সুব্যুৎপন্ন ও তন্ত্র জ্যোতিষের অধ্যাপক। ইনি মহাতার্কিক ও একজন অধ্যবসায়ী গ্রন্থসঞ্চয়কারী ছিলেন। ইঁহার আচার নিষ্ঠা খুব কঠোর ছিল। ফলিত জ্যোতিষে বিশেষ অধিকার ছিল।
শিবরাম ঠাকুর
রামরামঠাকুরের ২য় পুত্র। সংস্কৃতি সুব্যুৎপন্ন এই ঠাকুর সংহিতা শাস্ত্রে পারদর্শী ছিলেন। মেধা বড়ই প্রখর ছিল। মনুসংহিতা অনুলোম-বিলোমে কণ্ঠস্থ ছিল। তাঁহার সময়েই সহমরণ প্রথা আইননিষিদ্ধ হইবার চেষ্টা চলে। রাজা রামমোহন রায় উহাতে অগ্রণী হইয়াছিলেন। ঠাকুর সেই প্রসঙ্গে রাজার সহিত সাক্ষাৎ করেন ও কথায় কথায় মনুসংহিতার শেষ হইতে আরম্ভ করিয়া গোড়া পর্য্যন্ত মুখস্থ আবৃত্তি করিয়া যান। রাজা বিস্মিত হইয়া বলেন, “ঠাকুর, আপনি অসামান্য মেধাবী। কিন্তু এ আইন আর রক্ষা করা যার না। ঠাকুর ক্ষুন্নমনে ফিরিয়া আসেন। রাজা তাঁহাকে একটি গিনি পুরষ্কারস্বরূপ দিতে গেলে তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।
হরঠাকুর
শিবরাম ঠাকুরের পুত্র। বংশোচিত গুণসম্পন্ন ছিলেন।
অঘোরনাথ বিদ্যারত্ন
হরঠাকুরের জ্যেষ্ঠ পুত্র। পিতামহের মেধা ব্যুৎপত্তি ও সংহিতা প্রিয়তা পাইয়াছিলেন। ঋষিবাক্যের মত সব শ্লোক রচনা করিতেন। সদ্যোজাত সংহিতা নাম দিয়া তিনি যে সব প্রমাণবচন প্রস্তুত করিতেন শুনিলে কেহ বলিতে পারিবেনা যে উহা ঋষিবাক্য নহে। একটা উদাহরণ দি; তিনি দেশের ঘেঁটু পূজার এক বচন করেন, উহা এই: –
স্বসুতান্তনিশান্তমংশুমান্
পরিহায়াণ্ডজমেতি যদ্দিনে।
উষসীন্দুকলাললাটজং
পথি ঘণ্টাশ্রুতিমঙ্গনার্চয়েৎ।
স্ত্রীলোকেই ঘেঁটু পূজা পথের উপরেই প্রাতঃকালে করিয়া থাকে এবং উহা মীন সংক্রান্তি চৈত্রারম্ভেই হয়। আর ঘণ্টাকর্ণ ঠাকুর শিবের পুত্র বলিয়া বলা হয়। দেখুন কেমন বচন। আরও এমন অনেক আছে।
“সর্ব্বত্রৈব গ্রহীতব্যা নেশা চাভয়দক্ষিণা,
ঋতে পটোলবার্ত্তাক্ সর্ব্বং সন্দগ্ধমামিষং”
... এমন কত শত। নিষ্ঠা আচার ও অমায়িকতায় ইনি সকলেরই শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন।
শ্রীকণ্ঠ ঠাকুর
অঘোর ঠাকুরের পুত্র। শান্তশিষ্ট লোক ছিলেন। অল্প বয়সেই গঙ্গালাভ হয়।
কৃষ্ণচরণ শিরোমণি
রামরাম সার্ব্বভৌমের ৩য় পুত্র। দর্শনশাস্ত্রে প্রকট ব্যুৎপন্ন এবং আচারানুষ্ঠানে একজন আদর্শ ব্যক্তি ছিলেন। এক সময় এক পর্য্যটক প্রাতিকামী ভাটপাড়ায় আসিয়াছিলেন। তিনি ইঁহার পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ হন ও অনেক দিন ইঁহার আশ্রয়ে থাকেন।
কৃষ্ণানন্দ বিদ্যারত্ন
রামরাম সার্ব্বভৌমের ৪র্থ পুত্র। একজন বড়দরের তান্ত্রিক ছিলেন। তান্ত্রিক অর্থাৎ তন্ত্রশাস্ত্রে পণ্ডিত।
গোবিন্দ বিদ্যাবাগীশ
কৃষ্ণানন্দের মধ্যম পুত্র। ইনি স্বীয় জ্যেষ্ঠ পিতৃব্য পণ্ডিত কেশরী কৃষ্ণচরণ শিরোমণির নিকট ন্যায়শাস্ত্রের অনেক গ্রন্থ অধ্যয়ন করেন, তাঁহার দেহান্ত হইলে এই বংশেরই উজ্জ্বলরত্ন হলধর তর্কচূড়ামণির নিকট পাঠ শেষ করেন। ইনি এমন বুদ্ধিমান্ ও প্রতিভাশালী ছিলেন যে তর্কচূড়ামণি মহাশয় কোন সভায় যাইবার পূর্ব্বে ইঁহার সঙ্গে শাস্ত্রালোচনা করিয়া তবে বাহির হইতেন। ন্যায়শাস্ত্র ভিন্ন অন্যান্য দর্শনশাস্ত্রেও ইঁহার প্রগাঢ় ব্যুৎপত্তি ছিল। তেলিনীপাড়ার জমীদার রামরাম বন্দ্যোপাধ্যায় ইঁহার নিকট বেদান্ত পড়িতেন। দুঃখের বিষয় বাণীর এই বরপুত্র কমলার কৃপায় একেবারে বঞ্চিত ছিলেন, অমন যে ধনকুবের রামরাম বন্দ্যোপাধ্যায় ইঁহার ছাত্র তাঁহার নিকট হইতে প্রভূত সম্মান ব্যতীত আর তেমন কিছুই পাইতেন না এমনিই ভাগ্যচক্রের প্রহেলিকা। যাহা হউক, তিনি নিজে দরিদ্র থাকিলেও তাঁহার আবির্ভাবে ভট্টপল্লী একদিন বড়ই সমৃদ্ধ হইয়াছিল।
কেদারনাথ সিদ্ধান্তরত্ন
গোবিন্দ বিদ্যাবাগীশের জ্যেষ্ঠ পুত্র। ইনি একজন জ্যোতিষে বড় পণ্ডিত ছিলেন। ইনি এই বংশেরই প্রসিদ্ধ চন্দ্রনাথ চূড়ামণির সহযোগে ৫ বৎসর
মিথিলায় থাকিয়া জ্যোতিষে কৃতী হইয়া আসেন। ফলিত জ্যোতিষে ইঁহার এত সূক্ষ্মতা ছিল যে বিচারফল বর্ণে-বর্ণে মিলিয়া যাইত। ইঁহার রচিত স্ফুটচন্দ্রিকা নামক সারণীগ্রন্থ আজিও ভট্টপল্লীজ্যোতির্ব্বিদ্ সম্প্রদায়ে সমাদৃত হইতেছে। ইঁহার ধারা নাই।
বেণীমাধব ঠাকুর
গোবিন্দ বিদ্যাবাগীশের কনিষ্ঠ পুত্র। ইনিও একজন বেশ জ্যোতিষী ছিলেন। জ্যোতিষের টোল ছিল ও তথায় অধ্যাপনা করিতেন। ইঁহার ধারা কন্যাগত।
রামদয়াল তর্করত্ন
কৃষ্ণানন্দের কনিষ্ঠ পুত্র। ইনি একাধারে নৈয়ায়িক স্মার্ত্ত ও জ্যোতিষিক ছিলেন। এমন প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন পণ্ডিত বড় অল্পই দৃষ্টিগোচর হয়। মহিষাদল বর্দ্ধমান প্রভৃতি বড় বড় রাজকুলে ইঁহার বিপুল সম্মান ছিল। মহষাদলের রাজা লছমন্ প্রসাদ গর্গ তাঁহার কোষ্ঠী গণনার পুত্র প্রাপ্তিরূপ ফল হাতে-হাতে পাইয়া তাঁহাকে বার্ষিক ৮ বিশি করিয়া ধান্য ব্যবস্থা করিয়া দেন। ১২৭০ সালে দানপত্র হয়। বর্দ্ধমান রাজসভায় তাঁহার ন্যায়শাস্ত্রে অদ্ভুত কৃতিত্ব দেখিয়া বর্দ্ধমান মহারাজ তর্করত্নের একান্ত গুণাকৃষ্ট হয়েন, এত গুণাকৃষ্ট যে মহারাজ স্বয়ং সময়ে সময়ে ভাটপাড়ায় তর্করত্নের ভবনে আসিয়া তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিয়া যাইতেন।
রামেশ্বর বিদ্যারত্ন
রামদয়ালের জ্যেষ্ঠ পুত্র। স্বনামধন্য পুরুষ। পিতার স্মৃতি ও জ্যোতিষবিদ্যার অব্যাহত প্রবাহ। বঙ্গদেশ তাহার সাক্ষী। গুপ্তপ্রেস, বাঙ্গালার প্রাধান ও প্রথম ধর্ম্মপঞ্জিকা, ইনি তাহার একজন অন্যতর প্রাণপ্রতিষ্ঠাকারী। ৪০ বৎসরকাল ঐ পঞ্জিকার গণনা ও ব্যবস্থা সকল সন্নিবেশ করতঃ উহাকে বঙ্গীয় হিন্দুর একমাত্র আদরণীয় পঞ্জিকা করিয়া গিয়াছেন। তিনি গিয়াছেন কিন্তু যতদিন বঙ্গে হিন্দুয়ানী থাকিবে, ততদিন তিনি হিন্দুর স্মৃতিমন্দিরে সম্মানিত হইবেন। পাণ্ডিত্যের সঙ্গে স্বভাবের ঔদার্য্যও বড় মনোমুগ্ধকর ছিল। মধুরোদার চরিত এই মহাত্মার কেহ শত্রু ছিল না। ইঁহার অভাবে ভট্টপল্লী বিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে।
বিশ্বেশ্বর ঠাকুর
রামদয়ালের কনিষ্ঠ পুত্র। শান্তশিষ্ট সুব্রাহ্মণ ছিলেন।
কালীদাস তর্কালঙ্কার
শ্যামসুন্দর ঠাকুরের ২য় পুত্র। নৈয়ায়িক ছিলেন ও ন্যায়ের অধ্যাপনা করিতেন। পাণ্ডিত্য প্রশংসনীয় ছিল। মূড়াগাছার জমীদার কেশবরাম চৌধুরী অনেক ভূসম্পত্তি ইঁহাকে দেন। বংশধরেরা উহা এখনও ভোগ করিতেছেন।
প্রভুরাম ঠাকুর
কালীদাস তর্কালঙ্কারের পুত্র। তেজস্বী ও ক্রিয়াবান্ ছিলেন।
রামকমল ঠাকুর
প্রভুরামের জ্যেষ্ঠ পুত্র। বংশোচিত গুণসম্পন্ন ছিলেন।
উমেশচন্দ্র ঠাকুর
রামকমলের পোষ্য পুত্র। শান্তশিষ্ট অমায়িক সুব্রাহ্মণ ছিলেন।
ব্রজবিহারী ঠাকুর
উমেশচন্দ্রের পুত্র। শিষ্ট ব্রাহ্মণ ছিলেন। অকালে দেহ যায়।
হারাণচন্দ্র ঠাকুর
প্রভুরামের মধ্যম পুত্র। বংশোচিত গুণসম্পন্ন ও ন্যায়শাস্ত্রের অধ্যাপক ছিলেন। কাঁটালপাড়ায় ইঁহার টোল ছিল।
রাঘবরাম ঠাকুর
হারাণচন্দ্রের পুত্র। নির্বিরোধী ছিলেন।
কালীকুমার ঠাকুর
রাঘবরামের জ্যেষ্ঠ পুত্র। বড় উদার ছিলেন।
দুর্গারাম ঠাকুর
প্রভুরাম ঠাকুরের কনিষ্ঠ পুত্র। বংশোচিত গুণসম্পন্ন ছিলেন।
রামব্রহ্ম ন্যায়রত্ন
দুর্গারাম ঠাকুরের জ্যেষ্ঠ পুত্র। শান্তস্বভাব ও বংশোচিত গুণে গুণবান্ ছিলেন। কাশীতেই বাস করিতেন।
ভবানীচরণ ঠাকুর
কালীদাস তর্কালঙ্কারের ২য় পুত্র। পণ্ডিত গুরূচিতসদাচারসম্পন্ন ও
ক্রিয়াবান্ ছিলেন। ৺কাশীধামে শিষ্যদত্ত বাটীতে বাস করিয়া শেষে কাশীলাভই করেন। বাগানে বাড়ীর শাণ্ডিল্য মহাশয়েরা ইঁহারই দৌহিত্র সন্তান।
রামচন্দ্র ঠাকুর
কালীদাস তর্কালঙ্কারের ৩য় পুত্র। বংশোচিত গুণসম্পন্ন ছিলেন।
মধুসূদন ঠাকুর
রামচন্দ্রের জ্যেষ্ঠ পুত্র। বংশোচিত গুণসম্পন্ন ছিলেন।
রামতারণ শিরোমণি
মধুসূদনের পুত্র। একজন সুবক্তা সুরসিক ও সুপণ্ডিত ছিলেন। এমন সুমিষ্ট শ্লেষপূর্ণ সব বাক্য ব্যবহার করিতেন যে তাহা শুনিলে বড়ই আনন্দ হইত। মধুর শ্লোক রচনা করিতে পারিতেন। খাঁটি সংস্কৃত শ্লোক ব্যতীত তিনি বাঙ্গালা ও সংস্কৃত মিশ্রিত বড় মনোহর সব শ্লোক রচনা করিতেন। একটি নমুনা দেই:–
কলকাতা নগরে হ্যপূর্ব্বতটিনীতীরে বিলাসাস্পদে
আয়না লণ্ঠন ভূষিতে কতগুলা বাবুগুলা সব্ চুলাঃ।
দানে খর্ব্বমতিঃ কুকর্ম্মনিরতিঃ খান্-কীষু খুসীপরা
দৈবাদ্ ভাগবতী কথা যদি উঠে কেবা শোনে সে কথা॥
সুরসিক, সাত্বিক, নিষ্ঠাবান এই সুব্রাহ্মণ বংশের একজন গৌরবস্বরূপ ছিলেন। পর্য্যটনে ইঁহার বড় সখ ছিল। তখন পশ্চিমে অনেক স্থানে রেল হয় নাই, ইনি সে সবস্থানে পদব্রজে গিয়াছেন। যেখানেই যাইতেন অত্যন্ত আদর পাইতেন। নিজগুণে অনেক নূতন শিষ্য করিয়া গিয়াছেন।
নীলমণি ঠাকুর
রামচন্দ্রের মধ্যম পুত্র। বংশোচিত গুণসম্পন্ন ছিলেন।
রামকৃষ্ণ ঠাকুর
নীলমণির পুত্র। শান্তশিষ্ট সুব্রাহ্মণ ছিলেন। বহুদিন মা শীতলার সেবা করিয়াছেন। ইঁহার সম্পত্তি ভাগিনেয়গত হইয়াছে।
জয়রাম ঠাকুর
রামচন্দ্রের কনিষ্ঠ পুত্র। বংশোচিত গুণসম্পন্ন ছিলেন।
যদুনাথ ঠাকুর
জয়রাম ঠাকুরের পুত্র। পণ্ডিতসহচারী ও বংশগতবৃত্তিপ্রিয় ছিলেন।
বনমালী বিদ্যাসাগর
শ্যামসুন্দরের ৫ম পুত্র। তন্ত্রশাস্ত্রে সুপণ্ডিত ও একজন কৃতী পুরুষ ছিলেন। মাজনামুটার রাজা যাদবরাম চৌধুরীর নিকট দোরোপরগণায় যে ভূসম্পত্তি প্রাপ্ত হন উহা আজিও বনমালীচক্ নামে অভিহিত হইয়া বংশধরদের ভোগে আসিতেছে। ইঁহাকে পঞ্চু ঠাকুর অর্থাৎ পঞ্চম ঠাকুর বলা হইত।
হরিনারায়ণ ঠাকুর
বনমালী বিদ্যাসাগরের জ্যেষ্ঠ পুত্র। ইনি একজন প্রসিদ্ধ শাব্দিক পণ্ডিত ছিলেন।
যাদবচন্দ্র বিদ্যারত্ন
হরিনারায়ণের মধ্যম পুত্র। সংস্কৃত ভাষায় বেশ ব্যুৎপন্ন ছিলেন। বংশে ইনিই প্রথমে চাকরী স্বীকার করেন এবং শ্রীরামপুর মিসনারী কলেজে প্রধান সংস্কৃতাধ্যাপক হন। তখন সমাজে একটা হৈ চৈ পড়িয়াছিল।
নীলমাধব ঠাকুর
হরিনারায়ণের কনিষ্ঠ পুত্র। শান্তশিষ্ট মানুষ ছিলেন। ভাটপাড়া মাইনর স্কুলে বালকগণের বাঙ্গালা শিক্ষক ছিলেন। বর্ত্তমান সন্তানগণের তিনি অনেকেরই প্রথম শিক্ষাগুরু ছিলেন।
শ্যামাচরণ ঠাকুর
নীলমাধবের পুত্র। শান্তশিষ্ট সদাচারী সুব্রাহ্মণ ছিলেন। ই.বি.রেল অফিসে কাচলাপাড়ায় কর্ম্ম করিতেন।
শ্রীরাম ন্যায়বাগীশ
বনমালী বিদ্যাসাগরের মধ্যম পুত্র। প্রখর নৈয়ায়িক ও বংশোচিতগুণে গুণবান্ ছিলেন।
সীতানাথ ঠাকুর
শ্রীরাম ন্যায়বাগীশের জ্যেষ্ঠ পুত্র। ধার্ম্মিক সুব্রাহ্মণ ছিলেন।
যদুপতি তর্কবাচস্পতি
সীতানাথ ঠাকুরের পোষ্য পুত্র। ইনি একজন ন্যায়শাস্ত্রের অধ্যাপক
ছিলেন, অনেক ছাত্রকে অন্নদান ও বিদ্যাদান করিয়া গিয়াছেন। বংশোচিত নিষ্ঠাবান্ সুব্রাহ্মণ। ইঁহার ধারা কন্যা দৌহিত্রগত হইয়াছে।
দীননাথ বিদ্যারত্ন
শ্রীরাম ন্যায়বাগীশের মধ্যম পুত্র। স্মৃতি ও পুরাণ শাস্ত্রে সুপণ্ডিত অনুষ্ঠানান্বিত এই সুব্রাহ্মণ একজন ঋষিকল্প মহাপুরুষ ছিলেন। তাঁহাকে দেখিলে সহজেই লোকের শ্রদ্ধা আসিত। প্রাচীন বয়সেও বালকের ন্যায় সরলস্বভাব ছিলেন। সন ১২৯২ সালে ৮২ বর্ষ বয়সে ইঁহার গঙ্গালাভ হয়। ইঁহার পুত্র জীবিত ছিল না কিন্তু সুযোগ্য পৌত্রের উদ্যোগে ইঁহার শ্রাদ্ধ ভাটপাড়ার সমস্ত ব্রাহ্মণ-মণ্ডলীকে লইয়া খুব সমারোহের সহিত সম্পন্ন হইয়াছিল।
রঘুপতি ঠাকুর
দীননাথ বিদ্যারত্নের পুত্র। পিতার জীবিতকালেই অল্প বয়সে গঙ্গালাভ করেন।
কৃষ্ণকমল ঠাকুর
বনমালী বিদ্যাসাগরের কনিষ্ঠ পুত্র। বংশোচিত গুণসম্পন্ন ছিলেন।
রামোত্তম ঠাকুর
কৃষ্ণকমলের পুত্র। বংশোচিত গুণসম্পন্ন ছিলেন।
অবিনাশ ঠাকুর
রামোত্তমের জ্যেষ্ঠ পুত্র। শান্তশিষ্ট ছিলেন।
হরিনাথ ঠাকুর
অবিনাশের পুত্র। শান্তশিষ্ট। অকালে গত হন। ইঁহার ধারা নাই।
সূর্য্যকুমার ঠাকুর
রামোত্তমের কনিষ্ঠ পুত্র। বিদেশে ছোটখাট ডাক্তার ছিলেন।
বিজয়রাম ঠাকুর
শ্যামসুন্দরের ৬ষ্ঠ পুত্র। ইনি বুদ্ধিমান্ কৃতী ও বংশোচিত গুণসম্পদে বিভূষিত ছিলেন। কলিকাতাবাসী মাধবচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় প্রভৃতি কএকটি ইঁহার নিজ মন্ত্রশিষ্য ইঁহাকে প্রত্যক্ষ দেবতা বোধ করিতেন এবং তাঁহাদের যে ঐশ্বর্য্য তাহা এই গুরুদেবেদেরই কৃপায় হইয়াছে এই বিশ্বাসে উহারা গরুদেবকে সকল অভাব হইতে অন্তরে রাখিতেন। ইনি বড়ই একজন অন্নদাতা মহাপুরুষ ছিলেন।
অযোধ্যারাম ঠাকুর
বিজয়রাম ঠাকুরের ২য় পুত্র। বিশিষ্ট নিষ্ঠাবান্ সুব্রাহ্মণ ছিলেন।
শম্ভুচন্দ্র বিদ্যাপঞ্চান}ন
অযোধ্যারামের পুত্র। সুব্যুৎপন্ন ও সুরসিক পণ্ডিত ছিলেন। কবিত্বশক্তি বেশ প্রস্ফুট ছিল। বাঙ্গালার তরজা ও পাঁচালীর মত যথেষ্ট কবিতা তিনি প্রস্তুত করিয়াছিলেন। তাঁহার বহির্বাটীতে বেশ একটি মজলিস্ বসিত, তিনিও বড় মজলিসী ছিলেন।
রাজারাম ন্যায়রত্ন
শম্ভু বিদ্যাপঞ্চাননের কনিষ্ঠ পুত্র। ইনি একজন জন্মান্তরসংস্কারসম্পন্ন
তীক্ষ্ণবুদ্ধি ব্যক্তি ছিলেন। ন্যায়শাস্ত্র হইতে সঙ্গীতশাস্ত্র পর্য্যন্ত যেন ইঁহার পূর্ব্ব জন্মের উপার্জিত সম্পদ। এরূপ প্রতিভা বড় অল্পই দেখা যায়। সমাজ ইঁহা হইতে যথেষ্টই আশা করিয়াছিল কিন্তু ভাগ্যচক্রের আবর্ত্তনে ইঁহার সম্পদ সমাজের কাজে লাগে নাই। অল্প বয়সেই ইঁহার দেহাবসান হয়।
রামগতি ঠাকুর
বিজয়রামের ৩য় পুত্র। বংশোচিত গুণসম্পন্ন ছিলেন।
ঠাকুরদাস ঠাকুর বা দাশুঠাকুর
রামগতির পুত্র। সুরসিক ছিলেন।
আদ্যনাথ ঠাকুর
দাশুঠাকুরের পুত্র। নির্ভীক পুরুষ ছিলেন।
কমলাকান্ত বাচস্পতি
বিজয়রামের ৪র্থ পুত্র। ইনি সুপণ্ডিত ও বংশোচিত গুণসম্পন্ন ছিলেন। কিন্তু বংশের অভাগ্যবশেই অকালে ইঁহার অবসান হয়।
কৃষ্ণহরি শিরোমণি
কমলাকান্ত বাচস্পতির পুত্র। ইনি বাল্যকালে পিতৃহীন হইয়াও ভাগ্যবশে স্বনামধন্য পুরুষ হন। শব্দশাস্ত্রে ব্যুৎপন্ন এবং তন্ত্রশাস্ত্রে বড়ই প্রবিষ্ট ছিলেন। ইঁহার সদাচার ও অনুষ্ঠানের প্রভাবে শিষ্যবর্গ বড়ই অনুরক্ত ছিল, অনেক নূতন শিষ্যও ইনি করিয়াছিলেন। ইঁহার স্বাস্থ্যে একটা বিশেষত্ব ছিল, ইনি সপ্তাহান্তে একবার মাত্র শৌচে যাইতেন অথচ বেশ আহারাদি করিতেন, কোন গ্লানি হইত না। গুড় বড়ই ভালবাসিতেন, এত প্রিয় ছিল যে সন্দেশও গুড় মাখিয়া খাইতেন, তা ছাড়া প্রতি ব্যঞ্জনের সহিত গুড় মাখান না হইলে তাঁহার আহার হইত না। তাঁহার জীবনে একটা অদ্ভুত ঘটনা হয়। তিনি বিদেশে, পশ্চিমে। তখন সর্ব্বত্র রেল ছিল না পদব্রজে যাইতে হইত। একদিন পান্থশালায় আছেন একজন জ্ঞাতিভ্রাতা সঙ্গী। কূপ হইতে জল লইবার আবশ্যক হয়, দড়ি দিয়া বাঁধিয়া যেমন ঘটিটী কূপে ফেলিতে যাইবেন অমনি দেখিলেন কূপজলের মধ্যে তাঁহার মাতৃমুখ! কি সর্ব্বনাশ! এ কি! পরে সংবাদ পাইলেন ঠিক্ ঐ দিন, ঐ সময়ে তাঁহার মাতৃদেবীর গঙ্গালাভ হইয়াছে। যাইবার সময় স্নেহময়ী জননী পুত্রকে ঐরূপে দেখা দিয়া যান, ব্রাহ্মণ একেবারে গলিয়া গিয়াছিলেন।
জলধর ঠাকুর
কৃষ্ণহরি শিরোমণির জ্যেষ্ঠ পুত্র। বড় সদাশয় ধার্ম্মিক ও বংশোচিতগুণে গুণবান্ ছিলেন। অকালে ইঁহার দেহ যায়।
গিরিধর ঠাকুর
কৃষ্ণহরি শিরোমণির কনিষ্ঠ পুত্র। ইনিও ইঁহার জ্যেষ্ঠের মত গুণবান্ ছিলেন। উভয় ভ্রাতার বেশ সম্প্রীতি ছিল। ইঁহারও অকালে দেহ যায়।
রামধন ঠাকুর
বিজয়রামের ৫ম পুত্র। বংশোচিতগুণে গুণবান্ ছিলেন।
রামচন্দ্র ঠাকুর
রামধনের পুত্র। বংশোচিতগুণে গুণবান্ ছিলেন।
অতুলচন্দ্র ঠাকুর
রামচন্দ্রের পুত্র। ধীর স্বভাবের ব্যক্তি ছিলেন। ইঁহার কাশীলাভ হয়।
চারুচন্দ্র ঠাকুর
অতুলচন্দ্রের পুত্র। বড় আমুদে সরলস্বভাবের লোক ছিলেন। সুদূর পশ্চিমে সামরিক বিভাগে কর্ম্ম করিতেন। শিশুপুত্র রাখিয়া অসময়ে ইঁহার দেহ যায়। পুত্রে ইঁহার পুণ্য প্রকাশ।
ভোলানাথ ঠাকুর
\textit{শ্যামসুন্দর} ঠাকুরের কনিষ্ঠ পুত্র। যেমন পিতা তেমনি পুত্র। অধ্যয়ন, অধ্যাপনা, দান, প্রতিগ্রহ, প্রভৃতি ব্রাহ্মণোচিত কার্য্যেই রত ছিলেন। চতুষ্পাঠী ছিল, বহু ছাত্রকে অন্নদিয়া পড়াইতেন। ১৭৪১ শকে তিনি এক অত্যুচ্চ নবশেখর যুক্ত শিবমন্দির ও শিব প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁহার মন্দিরগাত্রের নিম্নলিখিত শিলালিপি তাঁহার ধর্ম্মপ্রাণতার সাক্ষ্য দিতেছে:–
যচ্ছম্ভোঃ পাদপঙ্কেরুহমমরগণৈরর্চ্চিতং চিত্তয়িত্বা
যাতাঃ পারংভবাব্ধেরতিবিমলধিয়ো জ্ঞানিনো দুস্তরস্য।
শ্রীভোলানাথশর্ম্মা নবশিখরযুতং মন্দিরং তস্য চক্রে॥
শাকেতনন্তাব্ধিবাজিক্ষিতিপরিবিমিতে প্রাপ্তয়ে তস্য দীনঃ
পাণিনি ব্যাকরণে ব্যুৎপন্ন এই মহাধীর স্বহস্থলিখিত ঐ ব্যাকরণ একখানি উহার বংশধরদের গৃহে আজও রহিয়াছে। ১৭১২ শকে উহা তিনি লেখেন। রাজা যাদবরাম চৌধুরীর নিকট হইতে ইনি দোরোপরগণার যে ভূসম্পত্তি পান উহা ভোলানাথচক্ নামে অভিহিত। ইনি আপনার চকে জলকষ্ট নিবারণ জন্য এক বৃহৎ পুষ্করিণী কাটাইয়া গিয়াছেন। “পুত্রে ষশসি তোয়েচ নরাণাং পুণ্যলক্ষণম্” এই পুণ্যাত্মার পুষ্করিণীর জল অমন লবণাক্ত প্রদেশেও প্রসিদ্ধ সুমিষ্ট হইয়া আজও অনেকের জীবন রক্ষা করিতেছে। কলিকাতা বড়বাজারের প্রসিদ্ধ গাঙ্গুলী বংশের আদিপুরুষ বিশ্বেশ্বর গাঙ্গুলী মহাশয় ইঁহারই মন্ত্রশিষ্য ছিলেন। এখনও এই উভয় ধারার সেই প্রাচীন গুরুশিষ্য সম্বন্ধ অব্যাহত রহিয়াছে।
উমাকান্ত ন্যায়পঞ্চানন
ভোলানাথ ঠাকুরের পুত্র। শরীরী পিতৃপুণ্য এই মহাত্বা ভাটপাড়ার একজন প্রসিদ্ধ স্মার্ত্ত পণ্ডিত ছিলেন। অনেক ছাত্র পড়াইয়া গিয়াছেন, এখনও তাঁহার ছাত্রধারা ভাটপাড়ায় বর্ত্তমান। এই বংশের মৃত্যুঞ্জয় শিরোমণি ইঁহারই ছাত্র। এই বংশের শ্রীধর বিদ্যারত্ন ও কৈলাশচন্দ্র বিদ্যারত্ন ইঁহারই চতুষ্পাঠী সমাগত পবিত্র মূর্ত্তি। এই বংশের হলধর তর্কচূড়ামণি ইঁহার প্রধান স্নেহাস্পদ ভ্রাতুষ্পুত্র ইনিই হলধরের পরমোপকারী, বিপদে সহায় পিতৃব্য। এই প্রাতঃস্মরণীয় মহাপুরুষ ভাটপাড়ার একদিন একজন বিশিষ্ট সম্পদ ছিলেন।
রামকৃষ্ণ ঠাকুর
উমাকান্ত ন্যায়পঞ্চাননের ২য় পুত্র। সংস্কৃতভাষায় ব্যুৎপন্ন সদাচারী সুব্রাহ্মণ ছিলেন।
শ্রীশচন্দ্র ঠাকুর
রামকৃষ্ণের পুত্র। মৃদুমধুরস্বভাব সংস্কৃতজ্ঞ ও সদাচারী সুব্রাহ্মণ ছিলেন।
মহেশ্বর ঠাকুর
উমাকান্ত ন্যায়পঞ্চাননের ৩য় পুত্র। বংশোচিতগুণে ভূষিত ছিলেন।
রাখালচন্দ্র ঠাকুর
মহেশ্বর ঠাকুরের ২য় পুত্র। বংশোচিতগুণে গুণবান্ ছিলেন।
নারায়ণচন্দ্র জ্যোতির্ভূষণ
রাখালচন্দ্রের পুত্র। স্বনামধন্য পুরুষ, জ্যোতিষে বড় পণ্ডিত ছিলেন। ইনি এই বংশের প্রসিদ্ধ রামেশ্বর বিদ্যারত্নের ছাত্র। কলিকাতায় বিশেষ নাম করিয়াছিলেন। ইনি ‘হোরাবিজ্ঞান রহস্য’ নামে বৃহৎ এক জ্যোতিষের গ্রন্থ বঙ্গানুবাদ সহ সঙ্কলন করিয়া দেশের মহোপকার সাধন করিয়া গিয়াছেন। এই কার্য্যের জন্য ইনি গবর্ণমেণ্ট হইতে পাণ্ডিত্যের পুরস্কারস্বরূপ ২৫/- টাকা করিয়া মাসিক বৃত্তি পাইয়াছিলেন। তেজস্বী ও অনুষ্ঠায়ী এই মহাপ্রাজ্ঞ অকালে ইহলোক ত্যাগ করায় দেশের বিশেষ ক্ষতি হইয়াছে। চিত্তরঞ্জন দাস প্রভৃতি মনীষিগণ ইঁহার গুণে মুগ্ধ ছিলেন।
ক্ষীরোদচন্দ্র ঠাকুর
মহেশ্বর ঠাকুরের কনিষ্ঠ পুত্র। বেশ সদালাপী ও সরলপ্রাণের লোক ছিলেন। পাত্র-পাত্রী অনুসন্ধান ও তাহার জন্য পরিশ্রম করিয়া অনেক গৃহস্থের বিবাহ কার্য্যে তিনি উপকার করিয়া গিয়াছেন। মনের অনুরূপ ইঁহার বেশ সহজ মৃত্যু হইয়াছিল।